কোরবানির পশুর চামড়া কিনতে ৯ ব্যাংক ঋণ দেবে ৫৮৩ কোটি

ইজাব টিভি ডেস্কঃ ঈদুল আজহা উপলক্ষে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া কিনতে ব্যবসায়ীদের তহবিলের জোগান দেয়ার বরাদ্দ রাখা হলেও ঋণ নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। গত বছর ঈদুল আজহার আগে ৫ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকসহ ৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংক এ খাতে বরাদ্দ রেখেছিল ৬৪৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। কিন্তু এর বিপরীতে ব্যবসায়ীরা ঋণ নিয়েছিল মাত্র ৬৫ কোটি টাকা। এবারও চামড়া কিনতে ব্যবসায়ীদের ৫৮৩ কোটি টাকার তহবিলের জোগান দেয়ার জন্য বরাদ্দ রেখেছে চার রাষ্ট্রায়ত্তসহ ৯ বাণিজ্যিক ব্যাংক। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রেখেছে রূপালী ব্যাংক ২২৭ কোটি টাকা। এরপর জনতা ব্যাংক ১৪০ কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংক ১২০ কোটি টাকা এবং সোনালী ব্যাংক ২৫ কোটি টাকা। বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে চামড়া কিনতে বেশি রেখেছে ইসলামী ব্যাংক ৬৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। ব্যাংকগুলোতে পৃথক পৃথক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, করোনাভাইরাসের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার কারণে চামড়া খাতে এমনিতেই চলছে মন্দা। যে কারণে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা কমে গেছে। এর প্রভাবে ব্যবসায়ীরা আগের মতো ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। এতে বেড়ে যাচ্ছে খেলাপি ঋণ। জানা গেছে, প্রতি বছরই ব্যাংকগুলো চামড়া কেনার জন্য ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে ব্যবসায়ীদের ঋণ দিয়ে থাকে। গত বছর কাঁচা চামড়া কেনার জন্য ৯টি ব্যাংক যে পরিমাণ বরাদ্দ রেখেছিল তার সামান্যই ঋণ নিয়েছে ব্যবসায়ীরা। তহবিলের সঙ্কটে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী চামড়া কিনতে পারেনি। এর ফলে পানির দামে চামড়া বিক্রি করে এর সুবিধাভোগীরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান মতে, গত বছর অগ্রণী ব্যাংক ১৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছিল। কিন্তু বিপরীতে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ২০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এবারও ব্যাংকটি এ খাতে ঋণ দিতে ১২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। রূপালী ব্যাংক গত বছর চামড়া খাতে ঋণ দেয়ার জন্য ১৫৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছিল। কিন্তু ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ১১ কোটি টাকা। এবারও ব্যাংকটি এ খাতে ঋণ দেয়ার জন্য সর্বোচ্চ বরাদ্দ রেখেছে ২২৭ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান মতে, জনতা ব্যাংক গত বছর ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছিল। কিন্তু কোনো ঋণই বিতরণ করা হয়নি। এবারও ব্যাংকটি ১৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে এ খাতে ঋণ দেয়ার জন্য। সোনালী ব্যাংক গত বছর ৭১ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছিল এ খাতে ঋণ দেয়ার জন্য। কিন্তু ব্যাংকটি ঋণ বিতরণ করেছিল ২০ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এবার ব্যাংকটি এ খাতে ঋণ দিতে বরাদ্দ রেখেছে ২৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া বেসিক ব্যাংক তিন কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেও গত বছর এক টাকাও ঋণ বিতরণ করতে পারেনি। এবার ব্যাংকটি চামড়া কিনতে কোনো অর্থই বরাদ্দ রাখেনি। বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে ইসলামী ব্যাংক গত বছর ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ১২ কোটি ২১ লাখ টাকা ঋণ দিয়েছিল। এবারো ব্যাংকটি কাঁচা চামড়া কিনতে ৬৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা রাদ্দ রেখেছে। আল আরাফা ইসলামী ব্যাংক গত বছর ৮০ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ঋণ দিয়েছিল মাত্র ১ কোটি টাকা। এবার ব্যাংকটি বরাদ্দ রেখেছে ১ কোটি ৯ লাখ টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান মতে, গত বছর ঢাকা ব্যাংক ৫০ কোটি টাকা, প্রাইম ব্যাংক ৫০ লাখ টাকা, বরাদ্দ রেখেও ঋণ শেষে ঋণ বিতরণ করতে পারেনি। আর এবার বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক আড়াই কোটি টাকা, এনসিসি ব্যাংক ৫০ লাখ টাকা এবং দি সিটি ব্যাংক ২০ লাখ টাকা চামড়া কিনতে ঋণ দেয়ার জন্য বরাদ্দ রেখেছে। ট্যানারির মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি শাহিন আহমেদ গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, যে পরিমাণ ঋণ বিতরণের তথ্য দেয়া হচ্ছে তার চেয়েও বেশি পরিমাণ ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো। ট্যানারিগুলো স্থানান্তরের কারণে ও করোনার প্রভাবে ব্যবসায়ীরা ঋণ পরিশোধ করতে পারেনি। ফলে অনেকেই ঋণখেলাপি হয়ে পড়েছেন। এ পরিস্থিতিতে তারা বিশেষ বিবেচনায় ঋণ নবায়নের সুযোগ চেয়েছেন। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে সার্কুলার দিয়েছে তা তাদের অনুকূলে না যাওয়ায় তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে সার্কুলার সংশোধনের জন্য অনুরোধ করবেন। তিনি সার্বিক অবস্থা তুলে ধরে বলেন, যদিও এবার আগের চেয়ে রফতানি বেড়েছে, তবে করোনা ও টানা লকডাউনের কারণে এখনো ইউরোপের বাজার স্বাভাবিক হয়নি। চীনের বাজারে চামড়া রফতানির সম্ভাবনা আছে। এখন যদি চীনের নন-ট্যারিফ বাধাগুলো কমানো যায় তাহলে বাজার সম্প্রসারিত হবে।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী চামড়া রফতানিতে আয় বেড়েছে। ইপিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে (২০২০-২১) চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি করে আয় হয়েছে ৯৪ কোটি ১৬ লাখ ডলার। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং এর আগের অর্থবছর থেকে প্রায় ৩১ শতাংশ বেশি। বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে আয় হয়েছিল ৭৯ কোটি ৭৬ লাখ ডলার। নতুন অর্থবছরে ১৩১ কোটি ডলারের রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে সরকার। এ দিকে আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে কাঁচা চামড়ার বিষয়ে বিটিএ সভাপতি বলেন, আগামী সপ্তাহে সরকার দাম বেঁধে দেবে। তবে বিশ্ববাজারে চামড়ার দাম যেহেতু বাড়েনি, তাই গত বছর সরকার যে দাম বেঁধে দিয়েছিল, আমরা চাই এবারও সেটি থাকুক। আসন্ন কোরবানি উপলক্ষে কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণসহ অন্যান্য বিষয়ে জরুরি বৈঠক করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ওই সভায় জানানো হয়, এবারও কোরবানির কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়া হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে এ দাম বেঁধে দেয়া হবে। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামে কেনার কারসাজি হলে অভিযুক্ত ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।